ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার তারানগর ইউনিয়নের দেউলী, বেউতা ও আশপাশের এলাকায় ‘ম্যাক্সওয়েল ওয়েস্টার্ন সিটি নামে পরিচালিত আবাসন প্রকল্পের কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ও ছাড়পত্র ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে প্রকল্পটির কার্যক্রম পরিচালনা এবং তিন ফসলি কৃষিজমি, নিচু জমি ও জলাভূমি ভরাট করে আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি,প্রকল্পটির কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। এসব অনুমোদন ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে কোম্পানিটি আবাসন প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও প্রকল্প এলাকার বড় একটি অংশ ছিল তিন ফসলি কৃষিজমি, জলাভূমি, নিচু জমি ও খাল। বর্তমানে এসব জমির বড় একটি অংশ বালু দিয়ে ভরাট করে আবাসন প্রকল্পে রূপান্তর করা হয়েছে। এতে এলাকার কৃষি, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কেরানীগঞ্জের দুই পাশে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদী থাকায় এ অঞ্চলের জলাভূমি ও নিচু জমি পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগরের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ)-এ কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকাকে জলাভূমি, জলপ্রবাহ এলাকা, কৃষিজমি ও অন্যান্য সংরক্ষণযোগ্য ভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ম্যাক্সওয়েল ওয়েস্টার্ন সিটি প্রকল্পের কার্যক্রম নিয়ে অতীতেও গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট প্রথম আলোতে কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন ও জলাশয়-কৃষিজমি ভরাট নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে তারানগর ইউনিয়নে ম্যাক্সওয়েল ওয়েস্টার্ন সিটির অবৈধভাবে বালু ভরাটের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছিল। এছাড়া ২০২৩ সালের ২০ জানুয়ারি দৈনিক সমকালেও এ প্রকল্পের অবৈধ আবাসন কার্যক্রম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, পূর্বের এসব সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশের পরও প্রকল্পটির কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। বরং এলাকায় জমি ভরাট ও প্লট বিক্রির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও ম্যাক্সওয়েল ওয়েস্টার্ন সিটিকে কেরানীগঞ্জের বড় আবাসন প্রকল্প হিসেবে প্রচার এবং প্লট বিক্রির কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
উল্লেখ্য, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ২ নভেম্বর ২০২২ তারিখে ম্যাক্সওয়েল ওয়েস্টার্ন সিটি প্রকল্পের বিরুদ্ধে বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পের ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা, ২০০৪ (সংশোধিত ২০১২ ও ২০১৫), রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০-এর বিধিবহির্ভূত কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়ে নোটিশ জারি করে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজউকের ওই নোটিশের নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করে এবং নোটিশের তোয়াক্কা না করেই কোম্পানিটি পরবর্তীতেও তাদের অবৈধ আবাসন প্রকল্পের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে, রাজউকের পক্ষ থেকে বিধিবহির্ভূত কার্যক্রম বন্ধের নোটিশ জারির পরও কীভাবে প্রকল্পটির কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে কি না। অভিযোগকারীরা আরও বলছেন, বিষয়টি শুধু একটি আবাসন কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে তিন ফসলি কৃষিজমি ও জলাভূমি সংরক্ষণ, পরিবেশ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নগর পরিকল্পনা এবং প্রকল্পের গ্রাহকদের স্বার্থ জড়িত। তাই রাজউকের প্রকল্প অনুমোদন, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন,পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিবেশগত ছাড়পত্র, জমির শ্রেণি পরিবর্তন এবং ভূমি ভরাটের অনুমতি ব্যতি রেখেই সকল ধরনের অবৈধভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এ বিষয়ে এলাকাবাসী সংশ্লিষ্ট সরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতি দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ।